সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ নেতারা যখনই একত্র হন, সেই মুহূর্তগুলো সাধারণত উষ্ণতা ও আন্তরিকতায় ভরপুর থাকে। সম্প্রতি দুবাইয়ের শাসক, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাকতুম এবং দেশের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান-এর একটি স্বতঃস্ফূর্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে।
৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ধারণ করা এই ভিডিওটি শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের অংশ ছিল। সেখানে দেশের দ্রুত উন্নয়নে ভূমিকা রাখা নানা ভাবনা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে দু’জন নেতার মধ্যে ছিল স্বচ্ছন্দ ও গভীর আলোচনা।
ভিডিওতে শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদ তাঁর টিমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্বীকার করে বলেন,
“মন্ত্রিপরিষদ, মানসুর আবদুল্লাহ ও সাইফ—এরাই মূলত আমাকে বহন করে চলেছেন।”
এর জবাবে প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ বলেন,
“আমার একটি ভিন্ন তত্ত্ব আছে, আবু রাশিদ। আমার বিশ্বাস, আরবরা এমন একজন নেতাকে অনুসরণ করতে চায়। আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘ জীবন দান করুন—এই সময়কালে আমিরাত যেভাবে উন্নতি করেছে, আপনি সেই সময়ের আশীর্বাদ।”
স্নেহভরে দুবাইয়ের শাসককে ‘ফাদার রাশিদ’ বলে সম্বোধন করে প্রেসিডেন্ট আরও বলেন,
“আবু রাশিদ, আপনিই এই সব ভাইদের এই পথে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং সব সমীকরণ ঠিক করেছেন। যেগুলো ভুল ছিল, আপনি সেগুলো সংশোধন করেছেন, আর যেগুলো সঠিক ছিল, সেগুলোকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছেন।”
প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য দুই দশকের অংশীদারিত্ব ও দেশের উন্নয়নে যৌথ নিষ্ঠার প্রতিফলন। এতে স্পষ্টভাবে উঠে আসে আমিরাতের নেতৃত্বে দলগত কাজের গুরুত্ব এবং শেখ মোহাম্মদের দিকনির্দেশনামূলক ভূমিকা।
দৃষ্টি ও সহযোগিতার ওপর গড়ে ওঠা আমিরাতের উত্তরাধিকার
ভাইরাল ভিডিওটি ছিল শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২০ বছরের নেতৃত্ব উদযাপনের বৃহত্তর একটি আয়োজনের অংশ।
এই অনুষ্ঠানে গত ২০ বছরে দেশসেবায় নিয়োজিত বর্তমান ও সাবেক মন্ত্রীরা একত্রিত হন—যে সময়টি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য ছিল ব্যাপক পরিবর্তন ও রূপান্তরের যুগ।
গত ২০ বছরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৯৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯১৮ বিলিয়ন দিরহাম থেকে বেড়ে ১.৭৭ ট্রিলিয়ন দিরহামে পৌঁছেছে। অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণ এবং তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর ফলেই এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
নন-অয়েল বৈদেশিক বাণিজ্য ৫৯৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৬ সালের ৪১৫ বিলিয়ন দিরহাম থেকে ২০২৪ সালে ২.৯ ট্রিলিয়ন দিরহামে পৌঁছেছে। একই সময়ে নন-অয়েল রপ্তানি বেড়েছে ১,৮২৭ শতাংশ—২৯ বিলিয়ন দিরহাম থেকে ৫৫৯ বিলিয়ন দিরহামে।
দেশের প্রবৃদ্ধিতে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এটি ২৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ ট্রিলিয়ন দিরহামের বেশি হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সরকার ২৬টি বড় অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে আমিরাতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি জনগণের কল্যাণ ও মানব উন্নয়নে সরকার ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করা হয়েছে ৬০ বিলিয়ন দিরহামের বেশি এবং সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০০ বিলিয়ন দিরহামেরও বেশি।
গত ২০ বছরে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ হয়েছে ১৭০ বিলিয়ন দিরহামের বেশি, যা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রতি সরকারের অঙ্গীকারকে তুলে ধরে।
বেসরকারি খাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি এমিরাতি নাগরিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ২০২১ সালে ‘নাফিস’ উদ্যোগ শুরুর পর থেকে এটি ৩৮৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
শাসনব্যবস্থা ও কৌশলগত দৃষ্টি
শেখ মোহাম্মদের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা আইন প্রণয়ন ও কৌশল নির্ধারণে অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। গত ২০ বছরে মন্ত্রিসভা ৫৫৮টি বৈঠক করেছে এবং প্রায় ১৬,০০০টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা দেশের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তিনি সাতটি মন্ত্রী পর্যায়ের রিট্রিট এবং ১৬টি বিশেষ বৈঠকের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সমাধান এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন সমাধান তৈরিতে সহায়ক হয়েছে।
এ সময় সরকার আইনি কাঠামোর ব্যাপক আধুনিকায়ন করেছে। ২০ বছরে ৮৫০টির বেশি আইন ও বিধিমালা জারি করা হয়েছে।
দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আইন আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হালনাগাদ করা হয়েছে এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত আইন প্রণয়ন ব্যবস্থা এবং ফেডারেল ও স্থানীয় আইনসমূহের জন্য একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা।
এই সময়ে বৈশ্বিক অঙ্গনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সুনাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশটি এখন ২৭৯টির বেশি বৈশ্বিক সূচকে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে ৫২৫টি সূচকে শীর্ষ পাঁচে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে ৭৩৮টি সূচকে শীর্ষ দশে থাকার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে এই শক্তিশালী অবস্থান সরকারের নীতিমালা ও কৌশলের কার্যকারিতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে।
অব্যাহত অগ্রগতির বার্তা
২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদ দেশের যাত্রাপথ ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। তিনি লেখেন,
“বিশ বছর আগে আমরা প্রথম স্থান অর্জনের লক্ষ্য স্থির করেছিলাম… কেউ কেউ আমাদের নিয়ে সন্দেহ করেছিল… আর আজ আল্লাহর অনুগ্রহে সংযুক্ত আরব আমিরাত এমন একটি উন্নয়ন মডেলে পরিণত হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে দেশগুলো অনুসরণ করতে চায়, এবং এই মডেল আরও বহু দেশে রপ্তানি হচ্ছে…”









